RSS

#0008

সুমিত কুমার আমার নাম। যে কাহিনীটি বলতে যাচ্ছি সেইটা শুনে হয়তো অনেক ধরনের প্রশ্ন থাকবে মনে কিন্তু আমি বলছি শুধুই একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য:

প্রায় ৫৫ বছর আগের কথা। আমার বাবা মহর্ষি কুমার ছিলেন শীবপুর এলাকার জমিদার। বাবা যেমন সবার কাছে সম্মানী ব্যক্তি ছিলেন আমি ছিলাম তার উল্টা। গ্রামের মানুষরা আমাকে বাঘের মত ভয় পেত। ভয় পাওয়ার কারণ ছিল আমি যখন তখন যে কারো বাসায় গিয়ে হানা দিতাম এবং যা পেতাম তাই খেয়ে সাবাড় করতাম । তাই কেও যদি আমাকে দূর থেকে দেখে ফেলতো আমি আসছি তাহলে ঘরের খাবার দাবার লুকিয়ে রাখা হতো।
বাবার জন্য তখন কেও কিছু বলতেও পারতো না আর সইতেও পারতো না।

এই সব কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। সংক্ষেপে বলতে গেলে গ্রামের মানুষ যে আমাকে শুধু ভয় পেত তাও না তারা আমাকে নিজের ছেলের মতই আদর করতো।

তখন শীবপুরে কোন মারামারি, হ্রেসাহ্রেসি, ছিল না। গ্রামের সবাই বাবার বিচারের উপর ভরসা করতো। এবং তখনকার দিনে শীবপুরে অশান্তির ছায়া ছিল না।

হটাৎ একদিন বাবার কাছে কিছু মানুষ এসে বলল:
- ঠাকুর, মাটির নিচ থেকে একটা মূর্তির মাথা বের হয়েছে।
-- কথায় ?
- পাশের গ্রামের যে দুষি বাঁশবন আছে সেখানে ।

[] বাবা সঙ্গে সঙ্গে চাঁদর পেঁচিয়ে রওয়ানা দিলেন বাঁশবনের দিকে এবং মা'কে বলে গেলেন ফিরতে রাত হবে।

সেদিন রাতে বাবা ফিরলেন না। পরদিন সকালে মা কিছু মানুষকে সেখানে পাঠালেন বাবার সংবাদ নিয়ে আসার জন্য কিন্তু সেদিন তারাও ফিরলও না।

পরদিন মা ঠিক করলেন তিনি নিজেই সেখানে যাবেন কিন্তু চাচা-চাচিরা মা'কে বাঁধা দিলেন।

এভাবে এক সপ্তাহ চলে গেল কিন্তু সেখানে যারা গিয়েছিল তারা একজনও সেখান থেকে ফিরলও না।

এর এক মাস পর মা মারা গেলেন। তখন আমার বয়স আনুমানিক ১২ কি ১৩ হবে। চাচা-চাচির ছায়ার তলে লালিত পালিত হতে থাকলাম। কিন্তু যত দিন গেল মনে হতে লাগলো চাচা-চাচি আমাকে আর সহ্য করতে পারছেন না তাই ঠিক করলাম আমি বাঁশবনে যাবও এবং বাবাকে খোঁজে বের করব।

একদিন দুপুর বেলা কাওকে কিছু না বলেই বাঁশবনের দিকে রওয়ানা দিলাম। বিকেল হয়ে আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল এবং আমি বাঁশবনের ঘন অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেললাম। অন্ধকারে ভয় লাগছিল বলে চোখ বন্ধ করে সেখানেই শুয়ে পড়লাম। যখন চোখ খুললো তখন দেখতে পেলাম একটা মেয়ে আমার সামনে বসে আছে। মেয়েটা আমাকে বলল:

- তুমি কি তোমার বাবাকে খোঁজতে এখানে এসেছ ?
-- হু
- আস আমার সাথে ।
-- আমি কোন কথা না বলে চুপচাপ মেয়েটার পিছু পিছু হাটতে লাগলাম।

কিছুদূর গিয়ে দেখলাম মেয়েটা একটা পাহাড়ের ঝোপের মধ্য দিয়ে ঢুকে গেল। আমিও তার পিছু পিছু সেখানে ঢুকলাম। ঢুকার সাথে সাথে মানুষের কান্না আর চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম:

- আমার বাবা কথায় ?
-- মেয়েটা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা দিয়ে দেখালো।
- আমি দেখতে পেলাম বাবা শুয়ে আছেন এবং বাবার হাত পা বাঁধা এবং বাবার বুকের উপর বিশাল একটা পাথর রাখা যে পাথর একটু পরপর উপরে উঠছে এবং বাবার বুকের উপর এসে পড়ছে। যখন বুকের উপর পড়ছে তখন বাবার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। বাবা চিৎকার করছেন এবং কাঁদছেন এবং বলছেন: হে খোদা, আমাকে ক্ষমা কর। আমি তোমাকে চিনতে ভুল করেছিলাম।

আমি তা দেখে এত ভয় পেয়েছিলাম যে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। যখন চোখ খুললও তখন দেখি আমার মা আমার সামনে বসে আছেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে মা'কে জড়িয়ে ধরলাম এবং আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম এইটা স্বপ্ন ছিল।

অথচ স্বপ্ন যে স্বপ্ন ছিল না তা বুঝতে পারলাম তখন যখন আমি বারান্দায় বসে পড়ালেখা করছিলাম এবং কিছু মানুষ এসে বাবাকে বলল:
- ঠাকুর, মাটির নিচ থেকে একটা মূর্তির মাথা বের হয়েছে।
-- কথায় ?
- পাশের গ্রামের যে দুষি বাঁশবন আছে সেখানের ভেতর ।

আমি বুঝতে পারলাম বাবার সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। তাই বাবাকে স্বপ্নের কথা বললাম কিন্তু বাবাকে ঠেকাতে পারলাম না। সেদিন সত্যি সত্যি বাবা ফিরলেন না। আমি মাকেও স্বপ্নের কথা বললাম: কিন্তু মা আমার কথা বিশ্বাস করলেন না।

এক মাস পর মা মারা গেলেন।

এর কিছুদিন পর আমি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এলাম। জায়গায় জায়গায় ঘুরপাক খেলাম। চুরি করলাম। হাজতে কাটালাম। গির্জা মন্দির দরগাহ্‌ সবজায়গাতে খোদাকে খোঁজার চেষ্টা করতে থাকলাম...

তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম:
-- কিছু পেলেন ?
- তিনি একটা মুচকি হাসি দিলেন কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না।
-- কিছুই কি পেলেন না ?
- আমি প্রথমেই বলেছিলাম আমি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তোমাকে এই গল্প বলছি।
-- কোন প্রশ্নের উত্তর ?
- সেইটা গল্পের মধ্যেই আছে ।

[] তারপর সন্ন্যাসী বাবা হাটতে হাটতে চলে গেলেন এবং একবার ফিরেও তাকালেন না। তাদের হয়তো ফিরে তাকানোর কোন নিয়মও নেই।

কিন্তু আমি ফিরে তাকালাম সুমিত কুমারের সেই ছোট্ট দুষ্টামি ভরা শৈশবে । জমিদারের ছেলে কি ছিল আর কি হয়ে গেছে। সারা গ্রাম একসময় যাকে সম্মান করতো সে এখন পথে ঘাটে হাটাহাটি করে এক অপরিচিত ভণ্ডদের মত, যার চুল লম্বা দাড়ি লম্বা, পড়নে থাকে ছেড়া ফাড়া দুর্গন্ধ যুক্ত কাপড়।

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

0 comments:

Post a Comment